জাতীয় সংসদ ভবনে গতকাল মঙ্গলবার সকাল ১১টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত চলা ওই সভায় অংশ নিয়ে বিশিষ্ট ব্যক্তিরা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মেয়াদ সুনির্দিষ্ট করা, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট শাস্তিমূলক ব্যবস্থার বিধান রাখা, স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র সংবিধানের শুরুতে রাখা, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ যুক্ত করা, স্বাধীনতার ইতিহাস বিকৃতি বন্ধে শাস্তির বিধান রাখা, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতায় ভারসাম্য আনা, অবৈধ ক্ষমতাদখল ও সংবিধানের মূলনীতি পরিবর্তন ঘটানোকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে যুক্ত করা, সংরক্ষিত নারী আসন বৃদ্ধি, তত্ত্বাবধায়ক সরকারে নিরপেক্ষ ব্যক্তিদের রাখা এবং সংবিধান পর্যালোচনার জন্য বিশেষজ্ঞদের নিয়ে কমিশন গঠনের প্রস্তাব করেছেন।
বিশেষ কমিটির চেয়ারপারসন সংসদ উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীর সভাপতিত্বে গতকালের সভায় উপস্থিত ছিলেন জাতীয় অধ্যাপক কবীর চৌধুরী, ড. আকবর আলি খান, অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল, অধ্যাপক রেহমান সোবহান, অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক, কলামিস্ট অজয় রায়, প্রবীণ সাংবাদিক এ বি এম মূসা, ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, অধ্যাপক জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, সাহিত্যিক সৈয়দ শামসুল হক, অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম, সৈয়দ আবুল মকসুদ, ড. মিজানুর রহমান, শাহরিয়ার কবির, ড. আসিফ নজরুল, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা এম হাফিজউদ্দিন আহমেদ ও এ এস এম শাজাহান এবং ড. বদিউল আলম মজুমদার। অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমেদ, সাংবাদিক ইকবাল সোবহান চৌধুরী, কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন,
অধ্যাপক এমাজউদ্দিন আহমেদ, অধ্যাপক মনিরুজ্জামান মিয়া, অধ্যাপক আনিসুজ্জামান এবং সাংবাদিক মাহফুজউল্লাহকে আমন্ত্রণ জানানো হলেও তাঁরা উপস্থিত হননি।
সভায় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মেয়াদ নির্ধারণ করে দেওয়ার প্রস্তাব করেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. আকবর আলি খান। সভা শেষে তিনি বলেন, ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন সম্পন্ন করার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। আর কোনোভাবেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে বাজেট প্রণয়নের ক্ষমতা দেওয়া যাবে না। তিনি বলেন, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য আনতে হবে। এ ক্ষেত্রে যেকোনো বিষয়ে রাষ্ট্রপতির আপত্তি বা পুনর্বিবেচনার প্রস্তাব দেওয়ার ক্ষমতা থাকতে হবে।
বাহাত্তরের সংবিধানের চার মূলনীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক বিষয়গুলো বাদ দেওয়ার সুপারিশ করেছেন জাতীয় অধ্যাপক কবীর চৌধুরী। বৈঠক শেষে তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত রাষ্ট্রীয় মূলনীতি ধর্মনিরপেক্ষতা রাখতে হলে এর সঙ্গে সাংঘর্ষিক রাষ্ট্রধর্ম ও বিসমিল্লাহ সংবিধান থেকে বাদ দিতে হবে। একই সঙ্গে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল ও ধর্মের অপব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা প্রয়োজন।
সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক বলেন, দুই জেনারেল (জিয়াউর রহমান ও এইচ এম এরশাদ) সম্পূর্ণ নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য সংবিধানে বিসমিল্লাহ ও রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম অন্তর্ভুক্ত করেছেন। এটা ছিল তাঁদের মন-মতলবি কাজ। ধর্মীয় বিশ্বাস থেকে তাঁরা এটা করেননি। মূল সংবিধানে ফিরে যেতে এবং ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বার্থে রাষ্ট্রধর্মের বিধান ও বিসমিল্লাহ বাদ দিতে হবে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা এম হাফিজউদ্দিন আহমেদ বিসমিল্লাহ, রাষ্ট্রধর্ম ও ধর্মভিত্তিক দল নিষিদ্ধের বিরোধিতা করেন। এই মুহূর্তে এগুলো বাদ দেওয়া সম্ভব নয় বলেও তিনি দাবি করেন। সভা থেকে বেরিয়ে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, এখন সংশোধনীতে ওইগুলো বাদ দিলে নতুন করে গণ্ডগোল লাগবে, অরাজক পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। তাই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে বিসমিল্লাহ, রাষ্ট্রধর্ম ও ধর্মভিত্তিক দলের বিষয়টি এড়িয়ে যেতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আসিফ নজরুল শুধু ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করার প্রস্তাবের বিরোধিতা করেন। তবে তিনি রাষ্ট্রধর্ম ও বিসমিল্লাহ বাদ দেওয়ার পক্ষে মত দেন।
একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির নির্বাহী সভাপতি শাহরিয়ার কবির রাষ্ট্রধর্ম, বিসমিল্লাহ ও ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলসহ ধর্মীয় অনুভূতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ধারাগুলো বাতিলের প্রস্তাব করেছেন। তিনি বলেন, 'বাহাত্তরের সংবিধানে বঙ্গবন্ধু যদি রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম ও বিসমিল্লাহ না রেখেও মুসলমান থাকতে পারেন, তবে এখন কেন হবে না?'
রাষ্ট্রধর্ম ও বিসমিল্লাহ রাখার ব্যাপারে বিরোধিতার কথা জানিয়ে টিআইবি চেয়ারপারসন অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল বলেন, ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধের যে ইতিহাস নিয়ে সংবিধান রচিত হয়েছে_এটা তার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তবে একজন মানবাধিকারকর্মী হিসেবে আমি ধর্মভিত্তিক দলের রাজনীতি নিষিদ্ধ করার কথা বলতে পারি না। তবে ধর্মকে ব্যবহার করা, কাউকে আঘাত বা হেনস্থা করা এবং অন্যের ধর্মের প্রতি ঘৃণা তৈরির উদ্দেশ্যে ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করা নিষিদ্ধ হতে হবে।
ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য আনতে হবে। আর রাষ্ট্রের অন্যান্য বিভাগের মতো বিচার বিভাগকেও সংসদের কাছে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।
সংবিধানকে আরো সংস্কারের জন্য বিশেষজ্ঞদের নিয়ে পর্যালোচনা কমিশন গঠনের প্রস্তাব করেছেন সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সাধারণ সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার। তিনি বলেন, বিশেষ কমিটির ক্ষমতা সীমিত, আর সংসদ সদস্য হলেও বিশেষ কমিটির সবাই সংবিধান বিশেষজ্ঞ নন। তাই সংবিধান সংস্কারের জন্য একটি কমিশন গঠন করতে হবে। যারা সংবিধান পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে অধিকতর সংশোধনের প্রস্তাব উত্থাপন করবে।
অধ্যাপক রেহমান সোবহান নির্বাচন কমিশনকে আরো শক্তিশালী করার প্রস্তাব দিয়েছেন বলে জানান।
লেখক সাংবাদিক সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেন, অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য যা যা করা দরকার সংবিধানে তাই করতে হবে। সংরক্ষিত নারী আসনের বিরোধিতা করে তিনি বলেন, সব রাজনৈতিক দল নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধনের শর্ত অনুযায়ী ৩৩ শতাংশ নারী প্রতিনিধি মনোনয়ন দিলে নারী প্রতিনিধির সংখ্যা বেড়ে যাবে।
আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণকে স্বাধীনতা সংগ্রামের দলিল হিসেবে সংবিধানে সংযুক্ত করার সুপারিশ করেছেন।
অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন বলেন, উচ্চতর আদালত পঞ্চম সংশোধনী বাতিলের সঙ্গে সঙ্গে আদি সংবিধানের ৩৮ অনুচ্ছেদ সম্পূর্ণভাবে পুনঃ স্থাপিত হয়েছে। ৩৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ধর্মের নামে রাজনীতি নিষিদ্ধ করার পক্ষে মত দিয়েছেন তিনি।
সভায় মানবাধিকার লঙ্ঘনে সুনির্দিষ্ট শাস্তির বিধান যুক্ত করার সুপারিশ করেছেন মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমান।
আজ সম্পাদকদের সঙ্গে বৈঠক : আজ বেলা ১১টায় জাতীয় পত্রিকার সম্পাদকদের সঙ্গে মতবিনিময় করবে বিশেষ কমিটি। এই বৈঠকে অংশ নিতে যে সব পত্রিকার সম্পাদককে আমন্ত্রণপত্র পাঠানো হয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে_কালের কণ্ঠ, ইত্তেফাক, ইনকিলাব, প্রথম আলো, সমকাল, যুগান্তর, জনকণ্ঠ, আমার দেশ, নয়াদিগন্ত, সংবাদ, ভোরের কাগজ, বাংলাদেশ প্রতিদিন, আমাদের সময়, ডেসটিনি, মানবজমিন, যায়যায়দিন, খবর, নিউ নেশন, নিউজ টুডে, ইন্ডিপেনডেন্ট, দ্য ডেইলি সান, দ্য ডেইলি স্টার, নিউএজ ও দ্য ফিন্যান্সিয়াল এঙ্প্রেস।
No comments:
Post a Comment