Monday, 10 June 2013

বহুরূপী মওদুদ

বিএনপির বর্তমান শীর্ষ নেতাদের মধ্যে চতুর ও বিজ্ঞ নেতা মিষ্টি ভাষী মওদুদ আহমেদ। দেশের রাজনীতিতে বহুবার আলোচিত-সমালোচিত
হয়ে বিতর্কিত হয়েছেন স্ব নামে। বর্তমানে আবারও সংবাদের কেন্দ্র বিন্দুতে পরিণত হয়েছেন তিনি। অনেকেই তাকে বহুরুপী মওদুদ বলে আখ্যা দিয়ে থাকেন। তবে সব কিছু ছাড়িয়ে নিজের মেধা ও চতুর বুদ্ধির বলে টিকে আছেন রাজনীতির মাঠে।


বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে দেখা যায় প্রায় প্রতিটি দলের উচ্চাসনে বসে আছেন বেশ কিছু বর্ণচোরা রাজনৈতিক নেতা। সেই তালিকায় অনেকের নাম থাকলেও বিএনপির মধ্যে দলের অনেক নেতাই একজন কে এদের কাতারে রাখতে চান। আর তিনি হলেন সনামধন্য আইনজীবী ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ। মিষ্টি ভাষি এই রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব বিগত জোট সরকারের আমলে আইনমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছিলেন। দেশের রাজনীতিতে তার পদচারণা বহু দিনের। তাকে নিয়ে সমালোচনার জায়গা একটাই। আর তা হচ্ছে মওদুদ আহমেদ তার এই দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যরিয়ারে একটি দলের হয়ে কাজ করেননি। সময়ের পালা বদলে দল পরিবর্তন করেছেন বহুবার। আর এটাই তার কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তার রাজনৈতিক ক্যরিয়ার দেখলে বিষটি পরিষ্কার হবে অনেকের কাছে। ছাত্রজীবনে নেজামে ইসলামীর ছাত্র সংগঠন ‘ছাত্রশক্তি’র মাধ্যমে রাজনীতির হাতেখড়ি হয় মওদুদ আহমেদের। ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয়ে প্রতিক্রিয়াশীল ছাত্র সংগঠন এনএসএফ এর রাজনৈতিক উইং হিসেবে এই চক্রটি মৌলবাদের ধারক বাহক ছিল বলে জানা যায়। ১৯৭০ সালে মওদুদ ইংল্যান্ড থেকে আইনের উচ্চশিক্ষা শেষ করে দেশে ফেরেন তখন দেশে স্বাধিকার আন্দোলনের জোয়ার শুরু হয়। সেই সময়ে আগরতলা মামলার শুনানীতে ব্যারিষ্টার আমিরুল ইসলামের পাশে থাকার সুবাদে একটা ভালো ইমেজ তৈরি হয় তার। সেই ইমেজ কাজে লাগিয়ে আওয়ামী লীগের টিকেটে নমিনেশনের চেষ্টা করেন। ১৯৭১ এর পর নিজেকে আওয়ামী লীগের নেতা হিসেবে পরিচয় দেন। কিন্তু সাবেক ছাত্রলীগ নেতাদের বিরোধীতায়র মুখে ১৯৭৩ সালের সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নমিনেশন পেতে ব্যর্থ হওয়ার পর আ’লীগের সাথে সম্পর্ক শেষ করেন। তবে শেখ মুজিবুর রহমানের উদারতার সুযোগে পল্লীকবি জসীমউদ্দিনের জামাতা পরিচয়ের সুবাদে পোস্টমাস্টার জেনারেল হিসেবে নিয়োগ পান। কিন্তু সেখান থেকে তিনি বরখাস্ত হন। এমনকি তাকে জেলেও যেতে হয়েছিল।

এরপর শেখ মুজিবুর রহমান হত্যার পর ১৯৭৫ সালে জিয়াউর রহমানের শাসনামলে তার উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ পান মওদুদ আহমেদ। চলে আসেন রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে। ১৯৭৯ সালে বিএনপির নমিনেশনে প্রথমবারের মতো এমপি হয়ে সংসদে আসেন। ওই সময় জ্বালানী এবং বিদ্যুত মন্ত্রনালয়ের দায়িত্ব পেয়ে উপ-প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ পান। এসময়ে দুর্নীতির অভিযোগে মন্ত্রীসভা থেকে বহিষ্কারও হন। এরপর জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর পালটে যায় মওদুদের চেহারা। ১৯৮২ সালে এরশাদের সামরিক শাসনে অন্যান্য নেতাদের সাথে মওদুদও গ্রেফতার হয়। সামরিক আদালতে পাঁচ বছরের জেলও হয়। এরপর এরশাদের সাথে গোপন বৈঠকে তার সাথে হাত মিলিয়ে মন্ত্রী সভার সদস্য হিসেবে শপথ নেন।

সেই হিসেবে দেখা যায় মওদুদের এই দীর্ঘ ক্যরিয়ারে বেশ কয়েকবার ক্ষমতায় আসেন তিনি। ১৯৮৬ সালে এমপি, ১৯৮৫-১৯৮৮ সালে এমপি (যোগাযোগ মন্ত্রী, উপ-প্রধানমন্ত্রী), ১৯৮৮-১৯৮৯ সালে এরশাদ সরকারের প্রধানমন্ত্রী, ১৯৮৯-১৯৯০ সালে এরশাদের ভাইস প্রেসিডেন্ট, সর্ব শেষ বিএনপি সরকারের আইনমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পান।

বর্তমানে কর্নেল তাহের বিষয়ে তার লেখা বইয়ের একটি অংশ নিয়ে দলের মধ্যে এবং বাইরেও বিতর্কিত হয়েছেন মওদুদ। মওদুদ আহমেদ প্রসঙ্গ এবং কর্নেল তাহেরের বিচারের রায় নিয়ে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির মূলতবি বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। এই প্রসঙ্গটি আসতেই মওদুদ আহমেদ তার লেখা 'ডেমোক্রেসি এন্ড দ্যা চ্যালেঞ্জ অব ডেভেলপমেন্ট: এ স্টাডি অব পলিটিক্স এন্ড মিলিটারি ইন্টারভেনসন্স ইন বাংলাদেশ' বইটি থেকে যে উদ্ধৃতি বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে তা সঠিক নয় বলে খালেদা জিয়াকে অবহিত করেন। ওই যাত্রা বেচে গেলেও দলে তার অবস্থান এখন বিতর্কীত হয়ে উঠেছে। গতকাল মওদুদের কুশপুত্তলিকা দাহ করেছে বিএনপিরই নেতা কর্মীরা।

তবে রায়ে উল্লেখ করা হয়, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ তার 'ডেমোক্রেসি এন্ড চ্যালেঞ্জ অব ডেভেলপমেন্ট : এ স্ট্যাডি অব পলিটিক্যাল এন্ড মিলিটারি ইন্টারভেনশন ইন বাংলাদেশ' বইয়ে অত্যন্ত প্রাঞ্জল ভাষায় ব্যক্ত করেছেন যে, এই বিচারের ট্রাইব্যুনাল গঠনের অনেক আগেই জেনারেল জিয়াউর রহমান পাকিস্তান ফেরত সামরিক অফিসারদের তুষ্ট করতে কর্নেল তাহেরকে ফাঁসি দেয়ার জন্য মনস্থির করেছিলেন। জেনারেল মঞ্জুরের উদ্ধৃতি দিয়ে লরেন্স লিফশুলজও একই বক্তব্য তার সাক্ষ্যে প্রতিধ্বনিত করেন।

আদালত এ প্রসঙ্গে বলেছে, যেহেতু ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ জেনারেল জিয়াউর রহমানের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠজন ছিলেন এবং তিনি জেনারেল জিয়ার মুখ থেকে এই কথাগুলো শুনেছেন বলে তার বইয়ে দাবি করেছেন সেহেতু তাকে অবিশ্বাস করার কোনো কারণ থাকতে পারে না।

তবে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক আইনমন্ত্রী মওদুদ আহমেদ দাবি করেছেন, কর্নেল তাহেরের মামলায় হাই কোর্টের রায়ের উদ্বৃতি দিয়ে তার বইয়ের যে তথ্য বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত তা সঠিক নয়। বুধবার ল রিপোর্টার্স ফোরামের কার্যালয়ে আয়োজিত এক সাংবাদিক সম্মেলনে ব্যরিস্টার মওদুদ এই বক্তব্য দেন।

তিনি বলেন, ‘আমার বইয়ের কোথাও বলা হয়নি, যে এ বিচারের ট্রাইব্যুনাল গঠনের অনেক আগেই জেনারেল জিয়াউর রহমান পাকিস্তান ফেরত সামরিক অফিসারদের তুষ্ট করতে কর্নেল তাহেরকে ফাঁসি দেয়ার জন্য মনস্থির করেছিল। আমার বইয়ে বিষয়টি সেভাবে ছিলো না।’

তিনি আরো বলেন, ‘প্রকৃতপক্ষে বইয়ের প্রাসঙ্গিক অংশটি ছিলো নিম্নরূপ, ‘কর্নেল তাহেরকে সাজা দেওয়ার প্রশ্নে পাকিস্তান প্রত্যাগত অফিসারেরা সব সময় তার মৃত্যুদণ্ড চেয়েছে। এ ব্যাপারে জিয়া ৪৬ জন সিনিয়র অফিসারের সাথে আলোচনা করেন। সকলে একবাক্যে তাহেরের জন্য চূড়ান্ত শাস্তির পক্ষে মতামত দেন।’ এখানে জিয়া মনস্থির করেছিলেন- এ ধরণের কোন বাক্য আমার বইয়ে নেই।’

মওদুদ বলেন, ‘স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় কর্নেল আবু তাহেরর আত্মত্যাগ ও সাহসী ভূমিকার জন্য তিনি সকল প্রশংসার দাবিদার। কিন্তু তার বিচারকার্য সম্পন্ন হয়েছে আজ থেকে ৪০ বছর আগে। তখনকার রাজনৈতিক সামাজিক এবং সামরিক প্রেক্ষাপট আজকের চাইতে সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরণের। এ বিচারকার্যকে তখনকার সময়ের প্রেক্ষাপটে বিবেচনা করা দরকার।’

নেতা কর্মীদের দাবি ও অভিযোগ আজ দলের এই বর্তমান অবস্থার জন্য দায়ি এসব নেতা। তাদের কারণে দলের আজ করুণ পরিণতি হয়েছে।

No comments:

Post a Comment